অপারেশন ট্রাইডেন্ট কী?
![]() |
| ১৯৭১ সালের ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধে পরিচালিত ভারতীয় নৌবাহিনীর ঐতিহাসিক 'অপারেশন ট্রাইডেন্ট'। |
ভূমিকা :
অপারেশন ট্রাইডেন্ট’ ছিল ১৯৭১ সালের ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধের সময় ভারতীয় নৌবাহিনীর একটি অত্যন্ত সফল ও ঐতিহাসিক আক্রমণাভিযান। এর লক্ষ্য ছিল পূর্ব পাকিস্তানের (অধুনা বাংলাদেশের) মুক্তিযুদ্ধকে ত্বরান্বিত করা এবং পাকিস্তানের যুদ্ধক্ষমতা ভেঙে দেওয়া। এটি পরিচালিত হয় পাকিস্তানের করাচি বন্দরকে লক্ষ্য করে। ১৯৭১ সালের ৪ ডিসেম্বর রাতে এই অপারেশন চালানো হয়। ফলে পাকিস্তানের নৌবাহিনীর মনোবল ও সক্ষমতা মারাত্মকভাবে হ্রাস পায়।অভিযানের পটভূমি ও কারণ
১৯৭১ সালের ৩ ডিসেম্বর পাকিস্তান হঠাৎ ভারতের একাধিক বিমানঘাঁটিতে হামলা চালায় এবং আনুষ্ঠানিকভাবে যুদ্ধ ঘোষণা করে। এর জবাবে ভারতীয় নৌবাহিনী পাকিস্তানের অর্থনীতি ও নৌ-যোগাযোগের মূল কেন্দ্র করাচি বন্দর ধ্বংস করার পরিকল্পনা গ্রহণ করে।
এই অভিযানের প্রধান কারণগুলো হলো:
করাচি বন্দরে অবস্থিত পাকিস্তানের জ্বালানি ডিপো ও তেল সরবরাহের পথ বন্ধ করা।
শত্রুদেশের নৌবাহিনীকে বিপর্যস্ত করে পূর্ব পাকিস্তানে (বর্তমানে বাংলাদেশ) চলমান মুক্তিযুদ্ধে ভারতের অবস্থান শক্তিশালী করা।
অভিযানের পরিকল্পনা
ভারতীয় নৌবাহিনীর 'ওয়েস্টার্ন নোভাল কমান্ড'-কে এই অপারেশনের দায়িত্ব দেওয়া হয়। অভিযানে সোভিয়েত ইউনিয়নের তৈরি ক্ষুদ্র কিন্তু আধুনিক মিসাইল বোট ব্যবহার করা হয়:
মিসাইল বোট: INS নিপাত (INS Nipat), INS নির্ঘাট (INS Nirghat), এবং INS বীর (INS Veer)।
সহযোগী যুদ্ধজাহাজ: INS কিলতান (INS Kiltan) এবং INS কচ্ছ (INS Katchall)।
এই মিসাইল বোটগুলোতে ছিল অত্যন্ত শক্তিশালী P-15 Styx অ্যান্টি-শিপ মিসাইল, যা উপকূলে আঘাত হানতে সক্ষম ছিল।
হামলার বিবরণ
- মিসাইল নিক্ষেপ : ১৯৭১ সালের ৪ ডিসেম্বর রাতে ভারতীয় নৌবহর করাচি বন্দরের কাছে পৌঁছে। রাতের অন্ধকারে তারা পাকিস্তানি জাহাজ ও স্থাপনায় মিসাইল নিক্ষেপ করে।
- PNS খাইবার ডুবি : এই মিসাইল আক্রমণের সময় INS নির্ঘাট পাকিস্তানি ডেস্ট্রয়ার PNS খাইবার-এ আঘাত হানে। ফলে জাহাজটি ডুবে যায়।
- মাইনসুইপার ধ্বংস : INS নিপাত-এর মিসাইল পাকিস্তানি মাইনসুইপার PNS মুহাফিজ ধ্বংস করে।
- PNS শাহজাহান অকেজো : আরেকটি মিসাইল আঘাত হানে PNS শাহজাহান-এ, জাহাজটি মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং পরে অকেজো হয়ে পড়ে।
- কেমারি তেল ডিপো ক্ষতিগ্রস্ত : এছাড়া বন্দরের কেমারি তেল ডিপো লক্ষ্য করে ছোড়া মিসাইল বিশাল অগ্নিকাণ্ড সৃষ্টি করে, যা করাচির জ্বালানি সরবরাহ মারাত্মকভাবে ব্যাহত করে।
- বাণিজ্যিক জাহাজ ধ্বংস : একটি পাকিস্তানি বাণিজ্যিক জাহাজ MV ভেনাস চ্যালেঞ্জার-ও ধ্বংস হয়।
অভিযানের ফলাফল
- শূন্য ক্ষয়ক্ষতি: ভারতীয় পক্ষের কোনো ক্ষয়ক্ষতি হয়নি; সব নৌযান নিরাপদে ফিরে আসে।
- পাকিস্তানের মনোবল ভঙ্গ: পাকিস্তানের দুইটি যুদ্ধজাহাজ ডুবে যায়, একটি গুরুতর ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং করাচি বন্দরের জ্বালানি মজুতে বিশাল ক্ষতি হয়। ফলে পাকিস্তানের নৌবাহিনীর মনোবল ও সক্ষমতা মারাত্মকভাবে হ্রাস পায়।
- অপারেশন পাইথনের পথ সুগম: এই সাফল্যের ধারাবাহিকতায় ৮-৯ ডিসেম্বর ভারতীয় নৌবাহিনী করাচিতে 'অপারেশন পাইথন' (Operation Python) নামে আরেকটি সফল হামলা চালায়।
অপারেশন ট্রাইডেন্ট-এর গুরুত্ব
অপারেশন ট্রাইডেন্ট বিশ্ব সামরিক ইতিহাসে প্রথমবার মিসাইল বোটের নিখুঁত ও সফল ব্যবহারের উদাহরণ তৈরি করে।
নৌবাহিনী দিবস (Navy Day): ভারতীয় নৌবাহিনীর এই ঐতিহাসিক সাফল্যকে স্মরণে রাখতে প্রতি বছর ৪ ডিসেম্বর 'নৌবাহিনী দিবস' হিসেবে পালন করা হয়।
মুক্তিযুদ্ধে অবদান: এই অভিযানের ফলে পাকিস্তান পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের মধ্যে যোগাযোগ সম্পূর্ণ হারিয়ে ফেলে, যা বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধকে ত্বরান্বিত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল।
📌 প্রশ্নটি অন্য যেভাবে আসতে পারে :
- ‘অপারেশন ট্রাইডেন্ট’ কবে কী উদ্দেশ্যে পরিচালিত হয়?
- ‘অপারেশন ট্রাইডেন্ট’ কেন পরিচালিত হয়?
- কোন ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে ভারত সরকার ‘অপারেশন ট্রাইডেন্ট’ চালায়?
- ‘অপারেশন ট্রাইডেন্ট’-এর কারণ কী ছিল? এর গুরুত্ব লেখো।
📌 ইউনিট ৪-এর কিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন :
- ‘অপারেশন পাইথন’ কেন পরিচালিত হয়?
- আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা কেন হয়েছিল?
- নাসিক ষড়যন্ত্র মামলা সম্পর্কে সংক্ষিপ্ত আলোচনা করো।
- ‘ড্রেন অফ ওয়েলথ’ তত্ত্ব কী?
- জাতীয় কংগ্রেস প্রতিষ্ঠার কারণ বিশ্লেষণ করো।

.png)
মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন