জাতীয় কংগ্রেস প্রতিষ্ঠার পটভূমি বিশ্লেষণ করো।
![]() |
| জাতীয় কংগ্রেস প্রতিষ্ঠার পটভূমি |
ঊনবিংশ শতাব্দীর দ্বিতীয়ার্ধে ভারতের পাশ্চাত্য শিক্ষার প্রভাব, ব্রিটিশ শাসকের দমনপীড়ন, অর্থনৈতিক শোষণ, সংবাদপত্র ও জাতীয়তাবাদী সাহিত্য চর্চার প্রভাবে ভারতীয়দের মধ্যে রাজনৈতিক চেতনার বিকাশ ঘটে। এই রাজনৈতিক চেতনার প্রভাবেই ১৮৮৫ সালে ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের জন্ম হয়।
কংগ্রেস প্রতিষ্ঠার পটভূমি :
১) পাশ্চাত্য শিক্ষার প্রভাব :
উনিশ শতকে ভারতে তুমি পাশ্চাত্য শিক্ষা প্রসারের ফলে ভারতীয়দের মধ্যে জাতীয়তাবাদী চেতনার উন্মেষ ঘটে। ফলে শিক্ষিত মধ্যবিত্ত সম্প্রদায় ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনে অংশ নেওয়ার তাগিদ অনুভব করে।
২) ব্রিটিশ সরকারের শোষণের প্রভাব :
ব্রিটিশ সরকারের শাসন ও শোষণের বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন ধরে ক্ষোভ জমা হচ্ছিল। দাদাভাই নৌরোজি তাঁর Proverty and Un-British rule in India” গ্রন্থে লিখেছেন, “ভারত থেকে নিরন্তর সম্পদ নিঃসরণ ভারতীয়দের দেহ থেকে রক্তক্ষরণের সঙ্গে তুলনীয়।”
৩) নিরপত্তাবাতি তত্ত্বের প্রভাব :
অ্যালেন অক্ট্রিভিয়ান হিউমের জীবনীকার উইলিয়াম ওয়েডারবার্ন এর মতে জাতীয় কংগ্রেস প্রতিষ্ঠার পিছনে হিউমের নিরাপত্তা বাতি তত্ত্ব গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়েছিল। তাঁর মতে, হিউম ব্রিটিশের স্বার্থে ভারতীয়দের ব্রিটিশ বিরোধী ধ্বংসাত্মক শক্তির প্রতিরোধকল্পে জাতীয় কংগ্রেস প্রতিষ্ঠায় সচেষ্ট হয়েছিলেন। ঐতিহাসিক রজনীপাম দত্তও এই তত্ত্বের কথা স্বীকার করেছেন এবং লিখেছেন, “লর্ড ডাফরিন ও হিউমের গোপন চক্রান্তের ফলে ‘সেফটি ভালভ’ হিসেবে জাতীয় কংগ্রেস স্থাপিত হয়”।
৪) এলিট ও মধ্যবিত্তশ্রেণির প্রভাব :
ব্রিটিশ সরকারের পৃষ্ঠপোষকতায় গড়ে ওঠা এবং পাশ্চাত্য শিক্ষায় শিক্ষিত মধ্যবিত্ত, জমিদার এবং বণিক শ্রেণির অর্থনৈতিক দাবি-দাওয়া পূরণের জন্য একটি গণতান্ত্রিক সংগঠনের জন্ম হয়। এই ধরণের সংগঠনগুলোর (জমিদার সভা, মহাজন সভা, ইত্যাদি) সমন্বিত ও সর্বভারতীয় সংগঠন অন্বেষণের পটভূমিতেই জাতীয় কংগ্রেসের জন্ম হয় বলে কেউ কেউ মনে করেন। ১৮৮৫ থেকে ১৯০৫ সাল পর্যন্ত জাতীয় কংগ্রেসের নেতৃবৃন্দের শ্রেণিগত অবস্থান এবং তাদের দাবী দাওয়া বিশ্লেষণ করলে এই বক্তব্যের সমর্থন পাওয়া যায়।
৫) ভারতসভার প্রভাব :
জাতীয় কংগ্রেস প্রতিষ্ঠায় ভারত সভার প্রতিষ্ঠাতা রাষ্ট্রগুরু সুরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়ের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল। কারণ, তিনি সমগ্র ভারত ভ্রমণ করে একটি সর্বভারতীয় রাজনৈতিক সংগঠনের গুরুত্বের কথা তুলে ধরেন। ১৮৮৩ এবং ১৮৮৫ সালে তাঁর নেতৃত্বেই দুটি সর্বভারতীয় সম্মেলনও আয়োজিত হয়। ১৮৮৫ সালে ইন্ডিয়ান অ্যাসোসিয়েশন বা ভারত সভার বার্ষিক অধিবেশনের আয়োজন করা হয় এবং সুরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় সম্পাদিত দা বেঙ্গলি পত্রিকায় দাদাভাই নৌরোজী ‘জাতীয় কংগ্রেস’ কথাটি প্রথম উল্লেখ করেন।
৬) ড. সিতারামাইয়ার ত্রিমুখী প্রভাব তত্ত্ব :
ড. সিতারামাইয়ার মতে, ১৮৭৭ সালে মহারানী ভিক্টোরিয়ার সম্মানার্থে অনুষ্ঠিত দিল্লির দরবারে সমবেত নেতারা একটি সর্বভারতীয় প্রতিষ্ঠান গঠনের কথা ভাবেন। ১৮৮৩ সালে ব্রিটিশ সরকারের উদ্যোগে কলকাতায় অনুষ্ঠিত একটি সর্বভারতীয় প্রদর্শনী অনুষ্ঠানে এ ধরনের সংগঠন গড়ার ইচ্ছা প্রকাশ পায় এবং ১৮৮৪ সালে মাদ্রাজে থিওসফিকাল সোসাইটির জাতীয় অধিবেশনে একটি সর্বভারতীয় সমিতি গঠনের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। মূলত, এই ত্রিমুখী সিদ্ধান্তের প্রভাবে কংগ্রেসের মত একটি সর্বভারতীয় প্রতিষ্ঠান স্থাপনের পরিকল্পনা গড়ে ওঠে।
উপসংহার :
সুতরাং দেখা যাচ্ছে, জাতীয় কংগ্রেস প্রতিষ্ঠার পাঠভূমি নিয়ে ভিন্ন ভিন্ন মত থাকলেও এ কথা অনস্বীকার্য যে, ১৮৮৫ সালের পূর্ববর্তী সময়ে ব্রিটিশ সরকারের শাসন নীতির বিরূপ প্রতিক্রিয়ায় ভারতীয় জনমানসে ব্রিটিশ বিরোধী মনোভাব একটু একটু করে দানা বাঁধতে থাকে এবং ১৮৮৫ সালে একটি সর্বভারতীয় সংগঠনে রূপ নেয়। ড. অনিল শীলের ভাষায়, “জাতীয় কংগ্রেসের প্রতিষ্ঠা কোন আকস্মিক, চমকপ্রদ, অলৌকিক ঘটনা নয়। ভারতের ইতিহাসে এইরকম একটি প্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠার ক্ষেত্র কিছুকাল ধরে প্রস্তুত হয়েছিল এবং জাতীয় কংগ্রেসের মতো একটি প্রতিষ্ঠানের উদ্ভব ইতিহাসের নিয়মে অনিবার্য হয়ে পড়েছিল।”
------------xx-----------
এই প্রশ্নটি অন্য যেভাবে আসতে পারে :
- জাতীয় কংগ্রেস প্রতিষ্ঠার কারণ বিশ্লেষণ করো।
- কোন পরিস্থিতিতে ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস প্রতিষ্ঠিত হয় লেখো।
- কোন কোন ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে জাতীয় কংগ্রেস প্রতিষ্ঠা হয়েছিল বিশ্লেষণ করো।
- জাতীয় কংগ্রেস কেন গঠন করা হয়েছিল?
এই বিভাগের অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন :
- স্বদেশী ও বয়কট আন্দোলনের মধ্যে পার্থক্য উল্লেখ করো।
- জাতীয় কংগ্রেস প্রতিষ্ঠায় হিউমের ভূমিকা কী ছিল?
- নাসিক ষড়যন্ত্র মামলা সম্পর্কে সংক্ষিপ্ত আলোচনা করো।
- ‘ড্রেন অফ ওয়েলথ’ তত্ত্ব কী?

.png)
মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন