জাতীয় কংগ্রেসে চরমপন্থীদের উৎপত্তির কারণ (The reasons for the emergence of extremists in the Indian National Congress.)
![]() |
| ভারতে জাতীয় কংগ্রেসে চরমপন্থী আন্দোলনের উত্থানের পটভূমি ও কারণসমূহ। |
ভূমিকা : চরমপন্থী জাতীয়তাবাদ
ঊনবিংশ শতকের শেষ দশক (১৮৯০) থেকে জাতীয় কংগ্রেসের নরমপন্থী নেতৃবৃন্দের দুর্বলতা এবং সেই সূত্রে তাদের ব্যর্থতা প্রকট হয়ে ওঠে। তাদের এই দুর্বল নীতির (আবেদন নিবেদন নীতির) বিরুদ্ধে কিছু নেতা প্রতিবাদে মুখর হয়ে ওঠেন। এরই প্রেক্ষাপটে জাতীয় কংগ্রেসের অভ্যন্তরে এক ধরনের উগ্র জাতীয়তাবাদী মনোভাব গড়ে ওঠে, যা ‘চরমপন্থী জাতীয়তাবাদ’ নামে পরিচিত। চরমপন্থী মতবাদে বিশ্বাসী এই সমস্ত নেতা ও তাদের সমর্থকরা ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসে ‘চরমপন্থী’ নামে পরিচিত।চরমপন্থী মতবাদের উত্থানের পটভূমি :
১৯০৫ সালে বঙ্গভঙ্গের সময় কংগ্রেসের নরমপন্থী ও চরমপন্থী গোষ্ঠীর মধ্যে বিরোধ প্রকাশ্যে এসে পড়ে। ১৯০৭ সালে জাতীয় কংগ্রেসের সুরাট অধিবেশনে তা চরম আকার ধারণ করে। এবং কংগ্রেস দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে যায়।
১) নরমপন্থীদের দুর্বলতা :
ড. অমলেশ ত্রিপাঠি, ড. বিপানচন্দ্র প্রমুখ ঐতিহাসিকদের মতে নরমপন্থী আন্দোলনের দুর্বলতা থেকেই চরমপন্থার উদ্ভব হয়। এই পর্বে লর্ড কার্জন কংগ্রেসকে ‘অসুস্থ প্রতিষ্ঠান’ বলে উপহাস করতেন।
- কংগ্রেসের নরমপন্থী নেতাদের প্রধান দুর্বলতা হল তারা দাবি-দাওয়া আদায়ের ক্ষেত্রে আবেদন নিবেদনের নীতিতে এবং সরকারের সদিচ্ছায় বিশ্বাসী ছিলেন।
- নরমপন্থী নেতাদের পরিচালিত জাতীয় কংগ্রেসের সঙ্গে সাধারণ মানুষের কোন সম্পর্ক ছিল না।
- তাদের লক্ষ্য ছিল ইংরেজ শাসনের অধীনে থেকে কিছু সুযোগ সুবিধা আদায় করে নেওয়া।
- নরমপন্থী নেতাদের মধ্যে সক্রিয় গণআন্দোলনের প্রতি প্রগাঢ় অনীহা ছিল যা, শিক্ষিত তরুণরা মানতে পারেনি।
২) গোষ্ঠীদ্বন্দ্ব ও তার প্রভাব :
ঐতিহাসিকগণ চরমপন্থী জাতীয়তাবাদের উন্মেষের পিছনে কোন রাজনৈতিক আদর্শ নয়, কংগ্রেস নেতাদের মধ্যে গোষ্ঠীদ্বন্দই মূল কারণ ছিল বলে মনে করেন।
৩) লর্ড কার্জনের প্রতিক্রিয়াশীল নীতি:
ক্যালকাটা কর্পোরেশন আইন (১৮৯৯), ভারতীয় বিশ্ববিদ্যালয় আইন (১৯০৪), অফিসিয়াল সিক্রেটস আইন প্রভৃতি ভারতীয়দের ক্ষমতা ও স্বায়ত্তশাসন কেড়ে নেয়। এই নিপীড়নমূলক আইন ভারতীয়দের ক্ষুব্ধ করে তোলে।
৪) বঙ্গভঙ্গ (১৯০৫):
১৯০৫ সালে ব্রিটিশ সরকার সাম্প্রদায়িক ভিত্তিতে বাংলাকে দ্বিখণ্ডিত করে। এই ঘটনা সারা দেশে তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে। স্বদেশি ও বয়কট আন্দোলন চরমপন্থীদের প্রধান কর্মসূচি হয়ে ওঠে।
৫) ঔপনিবেশিক অর্থনৈতিক শোষণ:
দাদাভাই নওরোজির ‘ড্রেন তত্ত্ব’ অনুযায়ী ব্রিটেন ভারতের সম্পদ শোষণ করছিল। শিল্প ধ্বংস, কৃষকের দারিদ্র্য, দুর্ভিক্ষ ও মহামারির জন্য ব্রিটিশ শাসনকে দায়ী করা হয়। এই অর্থনৈতিক দুর্দশা চরমপন্থী চেতনার জন্ম দেয়। ঐতিহাসিক রজনীপাম দত্তের মতে, ১৮৫১ থেকে ১৯০০ সাল পর্যন্ত মোট ২৪টি দুর্ভিক্ষ হয়, যার জন্য মূলত ব্রিটিশরা দায়ী।
৬) শিক্ষিত তরুণদের হতাশা:
পাশ্চাত্য শিক্ষায় শিক্ষিত ভারতীয়রা প্রশাসনে উচ্চপদে চাকরি পেত না। বর্ণবৈষম্য, বেকারত্ব ও দারিদ্র্যের কারণে তারা ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে বিদ্বেষী হয়ে ওঠে এবং চরমপন্থায় আকৃষ্ট হয়।
৭) আন্তর্জাতিক ঘটনার প্রভাব:
১৮৯৬ সালে ইতালির কাছে আবিসিনিয়ার জয়, ১৯০৫ সালে জাপানের কাছে রাশিয়ার পরাজয়, বুয়র যুদ্ধে ব্রিটেনের পরাজয় (১৮৯৬), আয়ারল্যান্ড ও তুরস্কের সংগ্রাম—এইসব ঘটনার ফলে ভারতীয়দের মনে এই বিশ্বাস জন্ম নেয় যে এশিয়ার দুর্বল জাতিও সংগঠিত হলে সাম্রাজ্যবাদী শক্তিকে পরাজিত করতে পারে।
৮) সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় পুনর্জাগরণ:
স্বামী বিবেকানন্দের স্বদেশ প্রীতি ও ক্লীবতা বর্জনের আহ্বান, অরবিন্দ ঘোষের গীতার নিষ্কাম কর্মের সরল ব্যাখ্যা, তিলকের গণেশ উৎসব ও শিবাজি উৎসব, গীতার কর্মযোগ আদর্শ—এসব বিষয়গুলো ভারতীয়দের মধ্যে জাতীয় গৌরব ও আত্মমর্যাদা জাগ্রত করে। এই পুনর্জাগরণ চরমপন্থী আদর্শের ভিত্তি তৈরি করে।
৯) বলিষ্ঠ নেতৃত্বের আবির্ভাব:
এইভাবে বাল গঙ্গাধর তিলক, লালা লাজপত রায়, বিপিনচন্দ্র পাল, অরবিন্দ ঘোষ প্রমুখ প্রথম সারির নেতা কংগ্রেসের অভ্যন্তরে নরমপন্থার বিরোধিতা করে আপসহীন সংগ্রামের ডাক দেন। ১৯০৭ সালের সুরাট অধিবেশনে মতবিরোধ চরমে পৌঁছালে কংগ্রেস নরমপন্থী ও চরমপন্থী দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে যায়।
উপসংহার:
সুতরাং বলা যায়, ঔপনিবেশিক শোষণ, নরমপন্থী নীতির ব্যর্থতা এবং জাতীয় জাগরণের প্রভাবে কংগ্রেসের অভ্যন্তরে চরমপন্থীদের উদ্ভব ঘটে। তাঁদের আত্মনির্ভরশীল ও সংগ্রামী কর্মসূচি পরবর্তীকালে ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনকে আরও শক্তিশালী করে তোলে।
প্রশ্নটি অন্য যেভাবে আসতে পারে :
- জাতীয় কংগ্রেসে চরমপন্থীদের উত্থানের পটভূমি আলোচনা করো।
- কোন পরিস্থিতিতে ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসে চরমপন্থীদের উত্থান ঘটে?
- কোন কোন ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে জাতীয় কংগ্রেসের মধ্যে উগ্রজাতীয়তাবাদের জন্ম হয়?
- জাতীয় কংগ্রেসের মধ্যে কেন চরমপন্থী জাতীয়তাবাদ জন্ম নেয়?
ইউনিট ৪-এর কিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন :
- স্বদেশী ও বয়কট আন্দোলনের মধ্যে পার্থক্য উল্লেখ করো।
- জাতীয় কংগ্রেস প্রতিষ্ঠায় হিউমের ভূমিকা কী ছিল?
- নাসিক ষড়যন্ত্র মামলা সম্পর্কে সংক্ষিপ্ত আলোচনা করো।
- ‘ড্রেন অফ ওয়েলথ’ তত্ত্ব কী?
- জাতীয় কংগ্রেস প্রতিষ্ঠার কারণ বিশ্লেষণ করো।

.png)
মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন